ইসলাম ধর্মে মহান আল্লাহর ৯৯টি সুন্দর নামের একটি হলো 'আল-হাকীম', যার অর্থ হলেন ‘হিকমতওয়ালা’, ‘বিজ্ঞানময়’, ‘প্রজ্ঞাময়’। আর হিকমত ও প্রজ্ঞা বলতে বোঝায় সকল কর্ম যথাযথভাবে নৈপুণ্যের সাথে সম্পাদন করা। ঠিক তেমনি মহান আল্লাহ তাঁর সৃষ্টি জগতে যা কিছু সৃষ্টি করেছেন অথবা মানুষের জন্য বিধিবদ্ধ করেছেন, তার প্রত্যেকটির পেছনে রয়েছে পরিপূর্ণ যুক্তি ও হিকমত; তা আমরা বুঝতে পারি বা না পারি।
রোযা, যা আল্লাহ তাআলা বান্দার উপর ফরয করেছেন, তার পেছনেও রয়েছে অভাবনীয় যৌক্তিকতা ও অচিন্তনীয় উপকারিতা।
**আল্লাহর নৈকট্য লাভ:** রোযা এমন একটি ইবাদত যার মাধ্যমে বান্দা আল্লাহর নৈকট্য লাভ করতে পারে। রোযার সময় মানুষ তার প্রকৃতিগত প্রিয় জিনিসগুলো; যেমন খাওয়া-দাওয়া এবং যৌনক্রিয়া থেকে বিরত থাকে। এই বিরত থাকার মাধ্যমে সে তার প্রভুর সন্তুষ্টি কামনা করে এবং পরকালীন জীবনের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করে।
**তাকওয়া ও পরহেজগারী:** রোযা পালনের মাধ্যমে একজন মানুষ মুত্তাকী ও পরহেজগার হয়ে ওঠে। পবিত্র কোরআনে মহান আল্লাহ বলেন, “হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর রোযা ফরয করা হলো, যেমন তোমাদের পূর্ববর্তী উম্মতের উপর ফরয করা হয়েছিল। যাতে তোমরা পরহেজগার হতে পার।” (সূরা বাকারা: ১৮৩)।
**আত্মার তরবিয়ত ও চরিত্র গঠন:** রোযা মানুষের আত্মাকে পরিশুদ্ধ করে এবং তার চরিত্রকে সুন্দর ও আদর্শবান করে গড়ে তোলে। রোযার সংযমী জীবন মানুষের হৃদয়ে গভীর প্রভাব ফেলে এবং তাকে নৈতিকতাবিরোধী কর্ম থেকে বিরত রাখে।
**কু-অভ্যাস থেকে মুক্তি:** রোযা রোযাদারকে কু-অভ্যাসের দাসত্ব থেকে মুক্তি দান করে। এমন বহু মানুষ আছে, যারা এমন বহু নোংরা অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে এবং তার ফাঁদ থেকে বের হওয়ার কোনো পথ খুঁজে পায় না। কিন্তু রোযা এলে তাদেরকে দেখা যায় যে, তারা তাদের সে সমস্ত কু-অভ্যাসকে পরিপূর্ণরূপে বর্জন করে ফেলেছে।
**আল্লাহর প্রতি আত্মসমর্পণ:** রোযা পরিপূর্ণরূপে আল্লাহর নিকট আত্মসমর্পণ এবং তার পূর্ণ দাসত্ব করার কথা শিক্ষা দেয়। রোযা মুসলিমকে প্রকৃত দাসত্বের অনুশীলন দেয়। তাই সে রাতের বেলায় খায়, পান করে। কারণ, তার প্রভু যে বলেছেন, “আর তোমরা পানাহার করো, যতক্ষণ পর্যন্ত না (রাতের) কালো অন্ধকার থেকে ফজরের সাদা রেখা তোমাদের নিকট স্পষ্ট হয়েছে।” (সূরা বাকারা: ১৮৭)।
**গুনাহর কাফফারা:** রোযা হলো গুনাহর কাফফারা। কারণ, নেকীর কাজ গুনাহের কাজের গোনাহ নাশ করে দেয়। আর রোযা হলো বড় নেকীর কাজ। মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় পুণ্যরাশি (সওয়াবের কাজ) পাপরাশিকে দূরীভূত করে।” (সূরা হুদ: ১১৪)।
**ধৈর্য ও সহনশীলতা:** রোযা রোযাদারের মনে ধৈর্য ও সহনশীলতা সৃষ্টি করে। কষ্টে ধৈর্য ধারণ ও সহনশীলতা অবলম্বন করতে অভ্যাসী বানায়। রোযা তাকে তার প্রিয় বস্তু ব্যবহার বর্জন করতে ধৈর্যের শিক্ষা দেয়। যেমন শিক্ষা দেয় কাম-দমন ও মনের যথেচ্ছাচার দমন করার; যা নিশ্চয় সহজ কাজ নয়।
**ইহ-পরকালের খুশি ও সুখ:** রোযা রোযাদারের জন্য ইহ-পরকালের খুশি ও সুখের হেতু। যেমন মহানবী (সা.) বলেন, “রোযাদারের জন্য রয়েছে দুটি খুশি; প্রথম খুশি হলো ইফতার করার সময় এবং দ্বিতীয় খুশি হলো প্রতিপালকের সাথে সাক্ষাতের সময়।” (বুখারী: ১৯০৪)।
**ঈমান বৃদ্ধি:** রোযা রোযাদারের ঈমান বৃদ্ধি করে। এই রোযাতে মানুষ অধিকাধিক নামাজ পড়ে, কুরআন তেলাওয়াত ও যিকির করে, দান-খয়রাত করে, দোয়া ও ইস্তিগফার তথা তওবা করে, ওয়াজ-নসীহত শোনে। রোযা তাকে মন্দ কাজ করতে বাধা দেয়।
**সামাজিক উপকারিতা:** রোজার মাধ্যমে মুসলিমদের সামাজিক উপকারিতা সাধন হয়ে থাকে। রোজা হলো মুসলিম জাতির ঐক্যের নিদর্শন, সারা উম্মাহর মাঝে সংহতির প্রতীক, গরীব-ধনীর মাঝে সাম্য ও সম্প্রীতির চিহ্ন। এতে আম-খাস, আত্মীয়-স্বজন, আমীর-ফকিরের ভেদাভেদ চূর্ণ হয়ে যায়। সকলের মনে একটাই বোধ জাগে যে, মুসলিম জাতি হলো এক জাতি।
এইভাবে রোজা শুধুমাত্র একটি ধর্মীয় কর্তব্যই নয়, বরং এটি মানুষের আত্মিক, নৈতিক, সামাজিক এবং শারীরিক উন্নতির একটি মাধ্যম।
